যোগব্যায়ামে সুস্থ শরীর-মন

যোগ সম্পর্কিত যে ধারণা এবং চর্চা বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে, তা সুপ্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই প্রচলিত।
শরীরটা বেশ খারাপ যাচ্ছে ইদানীং আপনার, মন-মেজাজেরও কোনো ঠিক নেই। এই ভালো, এই আবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠছেন। ভাবছেন ডাক্তার দেখাবেন কিংবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন। শরীর আর মনের সমস্যা নির্ণয়ে ডাক্তার দেখাবেন তো অবশ্যই। কিন্তু আপনার শরীর-মনের সুস্থতা বজায় রাখবে প্রতিদিনের একটি মাত্র চর্চা। প্রশ্ন করতে পারেন, সেটা আবার কী? শরীরচর্চার এই পদ্ধতির নাম হলো যোগব্যায়াম।

যোগব্যায়াম মূলত একটি প্রাচীন শরীরচর্চা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা লাভ করা সম্ভব। ইতিহাস বলে, প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ যোগব্যায়াম চর্চা করে আসছেন। এই চর্চা পার্থিব-অপার্থিবের এক আশ্চর্য সম্মিলন, যার মাধ্যমে মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ জীবনযাপনে সক্ষম হয়। ‘যোগ’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘ইউগা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ মিলন, আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সংযোগ। পতঞ্জলির সংজ্ঞানুসারে ‘যোগ’ মানে হলো মনের পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করা। যোগ সম্পর্কিত যে ধারণা এবং চর্চা [বিভিন্ন শারীরিক ভঙ্গিমা ও আসন] বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে, তা সুপ্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই প্রচলিত। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার বিভিন্ন নমুনা থেকে ধারণা করা হয়, আর্যরা ভারতবর্ষে আসার অনেক আগে থেকেই এ ভূখণ্ডের পূর্বাংশে, বিশেষ করে বঙ্গে যোগের চর্চা ছিল। পরে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অনুষঙ্গ হিসেবে যোগ হয় ‘যোগ সাধনা’। যোগব্যায়ামের উদ্দেশ্য হলো শরীরকে সুস্থ রাখা, রোগাক্রান্ত শরীরের রোগমুক্তি এবং পরমাত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন ঘটানো। যোগব্যায়ামের যোগাসন, প্রাণায়াম, ধ্যান এবং সংকল্প, দেহের পাশাপাশি মনেরও প্রশান্তি ঘটায়। এ ছাড়া মানসিক শক্তি বৃদ্ধি এবং একাগ্রতা আনতে যোগব্যায়ামের জুড়ি নেই।

যোগব্যায়ামে একেক আসনে দেহে একেকভাবে চাপ পড়ে, যা দেহের বিভিন্ন অংশের উপকার সাধন করে। যোগব্যায়ামের বিভিন্ন আসনে কিছুক্ষণ থাকার পর একটি বিশেষ আসনে বিশ্রাম নিতে হয়, যাকে বলে শবাসন। মনকে চিন্তামুক্ত করে বালিশ ছাড়া চিৎ হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে দীর্ঘ দম নিয়ে শবাসন করতে হয়। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর বিছানায় শুয়ে অল্প সময়ের জন্য হলেও শবাসন করুন। শবাসনে আপনার শরীরের শক্তি ও মনের জোর বাড়বে। প্রতিদিন আধা ঘণ্টা শবাসন করলে মেরুদণ্ড ভালো থাকে, কঠোর শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ে এবং শরীরের যে কোনো ব্যথা দূর হয়। উল্লেখ্য, মেরুদণ্ড ও পাঁজরের হাড়ের মজ্জা থেকেই শরীরের বেশিরভাগ রক্ত উৎপন্ন হয়।

শবাসনের পর, সকালে নাশতার আগে করতে পারেন আরও দুটি যোগাসন। এক. পবনমুক্তাসন, দুই. ভূজঙ্গাসন। রাতে খাবার হজম হওয়ার সময় পেটে জমে ওঠা বায়ু আমাদের শরীরের এক-তৃতীয়াংশ রোগের জন্য দায়ী। ওপরের দুটি আসন পেট বায়ুমুক্ত করে ও হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। পবনমুক্তাসন হাঁপানি, পিঠ ও কোমর ব্যথা এবং ডায়াবেটিস রোগীর জন্যও উপকারী। ভূজঙ্গাসনও সব রকম পিঠ ও কোমর ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ত্রীরোগের উপশম করে। খাওয়ার পরে বজ্রাসন ছাড়া আর কোনো যোগাসন করা যায় না। বজ্রাসন হজম ও ভালো ঘুম হতে সহায়তা করে এবং কোমর থেকে পা পর্যন্ত শরীরের অঙ্গগুলো মজবুত রাখে।

যোগব্যায়ামের যত উপকারিতা

মানসিক চাপ কমায়

মানসিক চাপ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মানসিক চাপের ফলে মস্তিষ্কে চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যোগব্যায়াম মানসিক চাপ কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায়। সকালের সি্নগ্ধ আলোয় ঠাণ্ডা কোনো স্থানে বসে অথবা সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে মাত্র ১০ মিনিটের যোগব্যায়াম আপনার মানসিক চাপ মুক্ত করবে নিমেষেই।

রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়

যোগব্যায়াম আমাদের দেহে রক্ত সঞ্চালনের গতি বৃদ্ধি করে দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত সঞ্চালন ঘটায় সঠিকভাবে। ফলে দেহ থাকে সচল আর মস্তিষ্ক থাকে কর্মক্ষম।

হৃৎপিণ্ডের সুরক্ষায়

যোগব্যায়ামের বিভিন্ন আসন আমাদের দেহের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং শ্বাসনালির ভালো ব্যায়াম হয়। নিয়মিত যোগব্যায়ামের ফলে দেহের বিভিন্ন শিরা-উপশিরায় সঠিকভাবে রক্ত সঞ্চালন ঘটে বলে হৃৎপিণ্ডে কোনো ধরনের ব্লক বা বন্ধক তৈরি হওয়ার ভয় থেকে মুক্ত থাকা যায়।

শরীরের বাড়তি মেদ দূর করে

নিয়মিত যোগব্যায়ামের আরেকটি উপকার হচ্ছে, শরীরের বাড়তি মেদ দূর হয়। যার দ্বারা ওজন সংক্রান্ত যে কোনো জটিলটা থেকে দেহকে মুক্ত থাকে। সর্বোপরি যোগব্যায়াম শরীরকে ফিট রাখতে সহায়তা করে।

পিঠ, মেরুদণ্ড ও হাড়ের জয়েন্টের ব্যথামুক্তি

যোগব্যায়াম শরীরের হাড়ের বিভিন্ন জয়েন্টকে মজবুত করে তুলতে ভালো কাজে দেয়। প্রতিদিন যোগব্যায়ামে হাড়ের নমনীয়তা ঠিক থাকে এবং শরীরে হাড়ের জয়েন্ট, পিঠ এবং মেরুদণ্ডের ব্যথাজনিত সমস্যার উপশম করে।

ইমিউন সিস্টেম উন্নত করে

মানসিক স্বস্তি দেহের হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে, যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে যে কোনো ধরনের অসুখ থেকে বাঁচাতে পারে।

মডেল :তাইরা

ছবি :নাইমুল এইচ রক্তিম

মনে রাখতে হবে

ষ একজন ফিজিওথেরাপিস্ট, ডাক্তার কিংবা একজন বিশেষজ্ঞই বলতে পারেন কোনো ব্যায়াম কার পক্ষে উপকারী। সব ব্যায়াম সবার জন্য নয়। প্রচার শুনে, টিভি দেখে, বই পড়ে বা কারও কথা শুনে বায়াম করা ঠিক নয়। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সুতরাং একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করে যোগব্যায়াম করুন।

ষ ব্যায়াম করার আগে বা পরপরই বেশি পরিমাণে পানি খাওয়া ঠিক নয়। ব্যায়ামের পর একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর পানি খেতে পারেন।

ষ শরীর অসুস্থ থাকলে ব্যায়াম করার দরকার নেই।

ষ ব্যস্ততার কারণে যারা দিনের বেলা সময় করে উঠতে পারেন না, তারা রাতে ব্যায়াম করুন। এতে কোনো সমস্যা নেই।

ষ একবারে সাত-আটটির বেশি আসন অভ্যাস করা ঠিক নয়। আসনের সঙ্গে বয়স অনুযায়ী, প্রয়োজন মতো দু-একটি প্রাণায়াম, মুদ্রা অভ্যাস করলে অল্প সময়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। একেকটি আসন শেষে শবাসনে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।

ষ কম্বল, প্যাড বা নরম কিছুর ওপর আসন অভ্যাস করা জরুরি। শক্ত মাটি বা পাকা মেঝেতে অভ্যাস করলে যে কোনো সময় শরীরে আঘাত লাগতে পারে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*