বাংলাদেশে মূকাভিনয়ের অগ্রগতি

সোহাগ আশরাফ :

মূকাভিনয়ের সঙ্গা নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজন এর সঙ্গা দিয়েছেন। যারা বাংলাদেশে মূকাভিনয় নিয়ে চর্চা ও সাধনা করেছেন বা করছেন তাদের কাছেই এসব সঙ্গা শুনেছি। এছাড়া কিছু বই পাঠ করে এই শিল্প মাধ্যমের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা নিজে থেকেই করে নিয়েছি। স্বল্প জ্ঞানে যা বুঝেছি তা হচ্ছে –

মূকাভিনয় একটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম। ইংরেজি প্রতিশব্দ Mime বা মূকাভিনয় অর্থ হচ্ছে মুখে শব্দ না করে বা সংলাপ ব্যবহার না করে শারীরিক বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা। নাট্যশিল্পের এক বিশেষ দিক হচ্ছে এই মূকাভিনয়। বস্তুর অস্তিত্ব না থাকা সত্বেও ইলুশনের (Illusion মাধ্যমে অর্থাৎ দর্শকের চোখে বিভ্রম ঘটিয়ে সেই বস্তুকে অস্তিত্বে নিয়ে আসার এক আকর্ষণীয় কৌশল হচ্ছে মূকাভিনয়।

এটি একটি সহজ সঙ্গা। যা বই পড়ে জানতে পেরেছি। মূকাভিনয় শিল্পের সঙ্গে যাদের সংযোগ রয়েছে তাদের প্রত্যেকেই এই সঙ্গা জানেন। কিন্তু আমার আজকের আলোচনার বিষয় একটু ভিন্ন। আজকের আলোচনাটি আমার নিজস্ব উপলব্ধি থেকে প্রকাশ করছি।

বিশ্বের অনেক দেশে মূকাভিনয়ের প্রচার ও প্রসার ঘটলেও আমাদের দেশে তুলোনামূলক কম। এর কিছু কারণও রয়েছে। আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে যে যে শিল্প মাধ্যমগুলো বেশি প্রচলিত তার মধ্যে মূকাভিনয় শিল্পটির উপস্থিতি খুবই কম। তাছাড়া আমাদের মধ্যে এখনও একটি ধারণা রয়েছে যা সঠিক নয়। সাধারণ মানুষ মূকাভিনয় শিল্পীকে একজন জোকার হিসেবে চেনেন। তারা মনে করেন মূকাভিনয় শিল্পী শুধুই হাসির পাত্র। এক কথায়- সার্কাসের জোকার। সার্কাসের জোকারকে যেভাবে নিচু জাতের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, মূকাভিনয় শিল্পটিকেও সাধারণ মানুষ অতি সাধারণ শিল্প হিসেবে মনে করেন। তাই লজ্জায়, পারিবারিক উৎসাহ না থাকায়, কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায়, বড় শিল্পীর অভাব থাকায়, কম সংখ্যক সংগঠন থাকায় এবং প্রচার ও প্রসার না থাকায় আমাদের দেশে মূকাভিনয় এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। (আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং স্বল্প জ্ঞানে)

আর তাই বাংলাদেশে অন্যান্য শিল্প মাধ্যমগুলো এগিয়ে গেলেও, সরকারি সহযোগিতা থাকলেও অবহেলিত এবং হাস্যকর অবস্থানে রয়েছে মূকাভিনয় শিল্প।

এবার একটি কঠিন কথা বলি। কথাটি সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে। তা হচ্ছে- মূকাভিনয় একটি শিল্প হলেও আমার সাধারণ জ্ঞানে যা বুঝি তা হচ্ছে- প্রতিটি মানুষ জন্মের পর থেকে মূকাভিনয় করা শুরু করে এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মানুষ মূকাভিনয় করে থাকে। মূকাভিনয় প্রতিটি মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গি। এটি ছাড়া কেউ কোন ভাবেই তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না। একটি শিশু সে যখন কথা বলতে পারেনা, ঠিক তখন তার আচার-আচরণ, অঙ্গভঙ্গি দেখে তার পরিবারের সবাই বোঝে সে কি চায়। শিশুটির ওই আচরণই মূকাভিনয়। আবার একজন মৃত্যু পথযাত্রি হাসপাতালের বেডে ঘুমি হাতের ইশারায় কি চাইছে বা বলতে চেষ্টা করছে তাও আমরা সবাই বুঝি। এটাও এক প্রকার মূকাভিনয়। অর্থাৎ আমরা কেউই এ শিল্পের বাইরে নই।

অভাব শুধু একটাই তা হচ্ছে এর সঠিক সঙ্গা সাধারণ ভাবে সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। প্রচার ও প্রসারে এগিয়ে যেতে হবে। ঘরে ঘারে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সবাইকে বোঝাতে হবে – মূকাভিনয় আসলে কি?

গান, নৃত্য, অভিনয়, খেলা, আবৃত্তিসহ সব শিল্পকে মানুষ যেভাবে নাম শুনলেই চিনে নিতে পারে মূকাভিনয়কেও সেভাবে পরিচিত করতে হবে। কিন্তু এই কাজটি কে করবে?

Mime বা মূকাভিনয়ের জনক বলা হয় ফ্রান্সের মার্সেল মার্সো (Marcel Marceau) কে।

প্রাচীন রোমান যুগে এই শিল্পের প্রথম চর্চার ইতিহাস পাওয়া যায়। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক জায়গায় এর চর্চা হয়েছে। গ্রিসে সম্ভবত প্রথম Pantomime নামের একজন মুখোশ পরিহিত অভিনেতা মূকাভিনয় প্রদর্শন করেছিলেন। Pantomime একটি গ্রিক শব্দ যার অর্থ বিশুদ্ধ অনুকৃতি।

বাংলাদেশ জন্মের পর এদেশের সংস্কৃতিতে মূকাভিনয় শিল্পের কোন চিহ্ন বা অস্তিত্ব ছিলো না। ’৭০ দশকের মাঝামাঝি স্বাধীনতা প্রাপ্ত বিধ্বস্ত ভূমিতে এই শিল্প মাধ্যমকে প্রতিষ্ঠিত করার পাওনিয়র হিসেবে বীজ বপন করেছিলেন পার্থ প্রতিম মজুমদার ও কাজী মশহুরুল হুদা। এরপর তারা চারা গাছ রোপন করেছিলেন। কিন্তু সেই গাছ বড় হওয়ার আগেই তাদের উপস্থিতি এদেশ থেকে হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে চারা গাছকে বড় করতে এগিয়ে আসেন জিল্লুর রহমান জন। তিনি মূকাভিনয়ের দল গঠন করেন। মূকাভিনয়ের উপর বই লেখেন। ধীরে ধীরে মূকাভিনয়ের চর্চ্চা ছড়িয়ে পড়তে থাকে নাট্যাভিনয় ও আগ্রহীদের দ্বারা।

এরপর সেই চারা গাছে ফল ধারার আগেই বাংলার আকাশ থেকে হারিয়ে যান জিল্লুর রহমান জন। থমকে যায় মূকাভিনয় প্রচার ও প্রসার। এক কথায় অন্ধকারে আটকে যায় শিল্পটি।

সেই অন্ধকার সময়ে কিছু মানুষ এগিয়ে আসেন। যারা এই গাছের পরিচর্যা শুরু করেন। আজকের বাংলাদেশে মূকাভিনয় চচ্র্চায় তাদের অবদানই বেশি বলে আমি মনে করি। কারণ মরা বৃক্ষে তারাই ফুল ধরানোর কারিগর। বিশেষ করে চট্টগ্রামের একদল মূকাভিনয় শিল্পানুরাগীদের নিয়মিত প্রচেষ্টায় উক্ত অঞ্চল সহ বিভিন্ন স্থানে মূকাভিনয় পরিচিত হতে থাকে। নতুন নতুন মূকাভিনয় শিল্পী তৈরি হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন- রিজোয়ান রাজন (বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের সেক্রেটারি জেনারেল), রাজ ঘোষসহ আরও কয়েকজন। তারা প্যান্টোমাইম নামের মূকাভিনয়বিষয়ক পত্রিকাও বের করে।

ইসরাফিল আহমেদ রঙ্গন (বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ) তিনিও নিজের একান্ত প্রচেষ্টায় মূকাভিনয় নিয়ে কাজ করেন। এছাড়াও কিছু কাজ হয় তৎকালিন সময়ে।

’ ৯০ এর দশকে DUMB (Dhaka University Mime Brigade)- মূকাভিনয় নিয়ে অনেক কাজ করেন। তাদের অবদানও কোন অংশে কম নয়।

এরই মধ্যে আমাদের পাওনিয়রদের মধ্যে কেউ কেউ দেশে আসেন ভ্রমণে। কেউবা পদক গ্রহণের জন্য। কিন্তু মূকাভিনয়কে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের একটি ওয়ার্কশপ ছাড়া আর কোন পদক্ষেপ দেখা যায় না।

এদিকে ঢাকায় জাহিদ রিপন (বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের চেয়ারম্যান) তার থিয়েটার ‘স্বপ্নদল’ থেকে মাইমের উপর কিছু কাজ করেন। নতুন করে মূকাভিনয় পরিচিতি লাভ করে রাজধানীতে। এরপর নিথর মাহবুব তার নিজস্ব প্রচেষ্টায় চচ্র্চা চালিয়ে যান। তিনি গঠন করেন মূকাভিনয় সংগঠন ‘মাইম আর্ট’। তিনি ব্র্যাকের মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের কাছে মাইমকে পরিচিত করা কাজ করেন।

এর মধ্যে গঠন হয় বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশান। তাদের প্রচেষ্টায় এবং ব্যাক্তিগত উদ্যোগে আমাদের পাওনিয়রগণ দেশে ভ্রমণে এসে কিছু প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। ভারত থেকেও কেউ কেউ এসে প্রশিক্ষণ দেয়। বিগত কয়েক বছর কাজী মশহুরুল হুদা শিল্পকলা একাডেমীর মাধ্যমে এবং বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের সহযোগিতায় মূকাভিনয়ের উপর ওয়ার্কশপ করিয়েছেন। তার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে তারই ছাত্র মীর লোকমান মাইমকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পরিচিত করে বেশ কিছু কাজ করেন। বর্তমানেও সে সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।

অনেকেই জানতো না যে মূকাভিনয় দিবস নামে একটি দিবস আছে। যা বিশ্ব মূকাভিনয় দিবস হিসেবে পরিচিত। কাজী মশহুরুল হুদা নিজের প্রচেষ্টায় দেশে এসে প্রথম এই দিবসে র‌্যালির আয়োজন করেন। যার সহযোগিতায় ছিলো,

বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশান। তিনি নিজের অর্থ ব্যায় করে ওয়ার্কশপ, মূকাভিনয় প্রতিযোগিতা, মূকাভিনয় নিয়ে লেখা প্রতিযোগিতা করেন তারই সংগঠন বাংলাদেশ হুদা মাইম ক্লাব এর মাধ্যমে। কাজী মশহুরুল হুদা প্রবাসে থেকেও দেশের জন্য কিছু করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি ইতিমধ্যে অনলাইনে প্রকাশ করেছেন – mimeworldnews.com নামে প্রথম অনলাইন মূকাভিনয় পত্রিকা। নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন দেশের মাইম শিল্পের।

এছাড়া বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু মূকাভিনয় সংগঠন তৈরি হয়েছে। তারা নিজেদের প্রচেষ্টায় স্বল্প জ্ঞানের মধ্যে থেকেও মূকাভিনয়কে ভালোবেসে কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ শিল্পটিকে ধারণ করে দেশের বাইরে প্রদর্শনীর জন্য যাচ্ছেন। মূকাভিনয় নিয়ে কাজ করছেন অনেকেই। যাদের মধ্যে- প্যান্টোমাইম মুভমেন্ট, স্বপ্নদল, ঢাকা ইউনির্ভাসিটি মাইম এ্যাকশন, বাংলাদেশ হুদা মাইম ক্লাব, পরিবর্তন মাইম একাডেমি, মুক্তমঞ্চ নির্বাক দল (গাজীপুর), শামুক থিয়েটার (গাজীপুর), শ্রুতি কালচারাল একাডেমি (নারায়ণগঞ্জ) প্রভৃতি সংগঠন।

মোটক কথা এগিয়ে যাচ্ছে মূকাভিনয়। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন শিল্পীর। কিন্তু সঠিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব রয়েই গেছে। সেই সঙ্গে প্রচার-প্রসার এখনও অনেক কম। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরী।

[এতো অল্প কথায় সব তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার জানার বা তথ্যের ঘারতিতো রয়েই গেছে। কেউ বিষয়টিকে অন্য চোখে না দেখে, যদি কারও এর চেয়েও বেশি জানা থাকে বা তথ্য থেকে থাকে তবে আপনিও লিখুন। মূকাভিনয়কে প্রচার ও প্রসারিত করতে ভূমিকা রাখুন। তাতে করে এই শিল্পটি আরও এগিয়ে যাবে। এ মুহুর্তে এটিই বড় প্রয়োজন। কোন প্রকার হিংসা বা অহংকার দিয়ে শিল্প হয় না।]

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*