মূকাভিনয় একটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম

কাজী মশহুরুল হুদা :

‘মাইম ইজ দ্যা বর্ডার লাইন বিটুইন দ্যা এক্টিং এণ্ড দ্যা ড্যান্স’।

মূকাভিনয় একটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম হিসেবে উপরোক্ত উক্তি হলো নীতিগত সংঙ্গা। এক্টিং বা অভিনয় শিল্প যেমন একটি স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম, একই ভাবে নৃত্য বা ড্যান্সও স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম। তেমনি এই দুটির সীমারেখার আবর্তে সৃষ্টি হয়েছে মাইম বা মূকাভিনয়ের স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম। মূকাভিনয় পারফরমেন্সের ভেতর নিজস্ব টেকনিকের ব্যবহারে স্বক্রীয়তা বজায় রেখে স্বতন্ত্র মাধ্যমে রূপ ধারণ করে।

মূকাভিনয়ের পারফরমেন্সে অভিনয়ের ভঙ্গিমাকে টেকনিকের দ্বারা নৃত্যের ছন্দময়তায় পরিস্ফুটন ঘটে। ফলে স্বাভাবিক অভিনয় থেকে অতিরঞ্জিত আকার ধারণ করে।

অভিনয়ে ডায়ালগের সাথে অঙ্গপ্রত্যাঙ্গের সঞ্চালন ঘটে প্রয়োজনের মাত্রায়।

মূকাভিনয়ে কোন ডায়ালগ না থাকায়, ভাষাকে ভাবের মাত্রায় প্রকাশ করার জন্য অতিরঞ্জিত মুভমেন্টের প্রয়োজন ঘটে।

নৃত্যে ডায়ালগ না থাকায় ভাবের মাত্রাকে দৈহিক ছন্দময়তায় শব্দের তালে তালে প্রকাশ ঘটে।

প্রত্যেক মাধ্যম তার নিজস্ব গতিতে প্রকাশিত হয়। মূকাভিনয় দুই প্রকারে পারফর্ম করে। এক. গল্পকে বাস্তবতার অবয়বে মুখের ভঙ্গিমায় প্রকাশ করে। দুই. বিমূর্ত অবয়বে দৈহিক ভঙ্গিমায় প্রকাশ ঘটে, যেখানে মুখের অভিব্যাক্তি গৌন। মূকাভিনয় যখন স্বতন্ত্রী মাধ্যমে প্রকাশ ঘটানো হয়, তখন অতিরঞ্জিত মুভমেন্টের সাথে প্রতিটি সঞ্চালনের শুরু ও শেষে থাকে। এগুলো যখন হারিয়ে যায়, তখন দর্শকের কাছে নান্দনিকতার প্রকাশ ঘটে না।

আমরা অনেকেই মূকাভিনয়কে অভিনয়ের সাথে মিলিয়ে ফেলি। অনেকেই মূকাভিনয়কে অভিনয়ের মত করে প্রকাশ করি। এমনকি ভাষা বা কথা উচ্চরণ না করে মুখ নাড়িয়ে কথা বলার মত করে মূকাভিনয় করি যা নীতি বর্হিভূত।  মূকাভিনয়ে অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধারার বাইরে বেরিয়ে বর্ডার লাইনে থাকতে হবে, আবার মূকাভিনয়ে নৃত্যের স্বতন্ত্র ধারার বাইরে বেরিয়ে বর্ডার লাইনে থাকতে হবে। এই দুটি স্বতন্ত্র ধারার সংস্পর্শে নাটকীয় ছন্দময়তার মাঝে দৈহিক অঙ্গভঙ্গিমায় প্রকাশ ঘটবে অভিনব চমৎকারিত্ব। থিয়েটারিক্যাল অভিনয়ের ধারা থেকে বের হতে হবে। হিপনোটিক ইলিউশন সৃষ্টি হবে মূকাভিনয় টেকনিকের ব্যাবহারে। প্যান্টোমাইম সাধারণত কৌতুকারে একক বা দলগতভাবে প্রকাশ ঘটে। মাইম সিরিয়াস ঘটনা মূর্ত বা বিমূততায় প্রকাশ ঘটে একক বা দলগত ভাবে। মাইমো ড্রামার প্রকাশ ঘটে নাটকের মত গল্পের প্রকাশ ভঙ্গিমায়। কিন্তু থিয়েটারের আকারে নয়। মূকাভিনয়ের আকারে। এখানে আমাদের অনেকের মাঝে সীমাবদ্ধতা আছে।

নাটক বা থিয়েটারের প্রযোজনার মাঝে পরীক্ষা নীরিক্ষা চলে। তেমনি মূকাভিনয়ের মধ্যেও চলছে দুই ভাবে। স্বাভাবিক মূকাভিনয় বা চরিত্রায়নের দ্বারা, অপরটি করপোরিয়াল বা দৈহিক স্টাইলিস্ট মুভমেন্টের দ্বারা। মূকাভিনয়ের এক্সপেরিমেন্ট পাশ্চাত্যে ও এশিয়ায় পারিপার্শিকতার কারণে জীবন যাত্রার প্রকারভেদে ঘটনার সাথে কৃষ্টির ভিন্নতায় গল্পের প্রকাশ নিজ নিজ কালচারে ফুটে ওঠে কিন্তু নীতিমালাকে ভেঙ্গে নয়। মূকাভিনয়ের টেকনিক বা প্রকাশভঙ্গিমা অপরিবর্তনীয়। আমাদের যদি বর্ডার লাইনের অবয়ব সম্পর্কে ধারণা না থাকে তাহলে প্রকৃত মূকাভিনয়ের বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হব। মূকাভিনয়কে অভিনয় থেকে পৃথক করতে না পারলে স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যমকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হব না।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*