বিমূর্ত মূকাভিনয়

কাজী মশহুরুল হুদা
এ্যাবস্ট্রাকট মাইম বা বিমূর্ত মূকাভিনয় হচ্ছে, আর্ট ফর আর্ট সেক। ভিন্ন একটি ফর্ম বলা যায়। যেখানে মনের ভাব প্রকাশ করে টেল অব স্টেরির মাধ্যমে নয়। চলমান অঙ্গ সঞ্চালনের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে থিমেট্রিক্যালভাবে।

পৃথিবীতে ৩টি স্কুল অব মাইম আছে। একটি মার্সেল মারসোর স্টাইল। যেখানে মুখের অভিব্যক্তিই প্রধান এবং থিয়েট্রিক্যাল স্টোরি রয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত উপমহাদেশে এই মাইমেরই প্রচলন। অপর একটি মাইম হচ্ছে, এতিয়েন ডিক্র’র কর্পোরাল মাইম। যেখানে মুখের অভিব্যাক্তি নয়, দেহের অভিব্যাক্তিই প্রাধান্য। তৃতীয়টি হচ্ছে- লি কক্ এর ফিজিক্যাল মাইম। যেমন- উদাহরণ হিসেবে মোমেন সানঝ এর পারফরমেন্স।

কর্পোরাল আর্ট একটি বিমূর্ত মূকাভিনয়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। যে সকল শিল্পকর্মে বিমূর্ততা ফুটিয়ে তোলা যায় তারমধ্যে চিত্রকলা, নৃত্য, মিউজিক এবং মাইম অন্যতম স্থান দখল করে। একজন পেইন্টার যখন এ্যাসস্ট্রাকট চিত্র আঁকেন। তারমধ্যে কোন বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে না। তবে চিত্রকরের মনের ভাব ফুঁটে ওঠে। বিমূর্ত একটি অন্য স্তরের শিল্পকর্ম। সেই স্তরের ধ্যানধারণা না থাকলে বোধগম্য দূরূহ হয়ে ওঠে তাদের কাছে। উক্ত স্তরে উত্তীর্ণ না হলে অনেকের কাছে বিরক্তিকর হয়ে দেখা দেয়। বিমূর্ত জ্ঞান, ধারণা, ভাষা, অন্য একটি ধাপে অবস্থান করে। সেটা দেখার চোখ সৃষ্টি করতে হয়। অনুশীলন করতে হয়। গভীরতায় পৌছানোর মন মানসিকতা তৈরী করতে হয়। এ’ধরনের শিল্পকর্ম হয়তো অনেকেই বুঝতে পারেন না, কিন্তু উপভোগ করতে পারে পারফর্মেন্সের চমৎকারিতে। শিল্পকর্মের ভেতরে ঢুকতে না পারলেও রং এর ব্যবহার ও সৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করেন। তেমনি মাইম, নৃত্য, মিউজিকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

মাইমের উৎস হল চিন্তাশক্তি, কল্পনা, মনেরভাব। এরপর সৃষ্টি হয় ভাবের প্রকাশ। এই প্রকাশ ভঙ্গিতে থাকে টেকনিক, গল্প বা থীম। এগুলোকে অবলম্বন করে একজন মূকাভিনেতা নিজস্ব আঙ্ঘিকে দৈহিক অঙ্গভঙ্গিমায় প্রকাশ করে। প্রকাশ করার বিভিন্ন গতিময়তা আছে।

আমার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে- বিমূর্ত মূকাভিন চর্চার ক্ষেত্রে। এই ক্ষেত্রে বিচরণের জন্য নিজেকে বিমূর্ত মন মানসিকতার স্তরে নিজেকে অবস্থান করাতে হবে। তার জন্য সহজ উপায় হচ্ছে এ্যাবস্ট্র্যাক চিত্রকলা নঅবলোকন করে তার ভাবকে বোঝা। এরমধ্যে রয়েছে, ফর্ম, ভাব, অভিব্যাক্তি। হাসি, কান্ন, বিজয়, উৎফুল্ল, চঞ্চলতা প্রমুখ। নৃত্যশিল্পের মধ্যে রয়েছে বিমূর্ত অঙ্গভঙ্গির সঞ্চালন। বোধগম্য না হলেও ব্যাক্তির মুভমেন্ট প্রদর্শন আকর্ষনীয় হয়ে দেখা দেয়। তেমনিভাবে মিউজিক সৃষ্টি করে কল্পনা শক্তির বিকাশ। মিউজিক মনের ভাবকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মত মনের মাঝে খেলা করে। একজন মূকাভিনেতা সকল বিমূর্ততাকে তার অঙ্গভঙ্গিমায় চলমান করে মোবাইল পেইন্টিংস করে তোলে। নৃত্যের মুভমেন্টের মত গতিময়তা করে তোলে। মূকাভিনয়ের সঙ্গাই হচ্ছে- নৃত্য এবং থিয়েটার বর্ডার লাইন। এই বর্ডার লাইনে সৃষ্টি হয় স্বতন্ত্র শিল্প মাধ্যম এবং শিল্পকর্ম।

বিমূর্ততায় মূকাভিনয়ে মনের ভাব প্রকাশ করার বা চর্চার উপায় বা অনুশীলনের পদ্ধতি রয়েছে। সে বিষয়ের উপর কিছুটা আলোকপাত করব। যদি নিজস্ব পছন্দের একটা মিউজিক পছন্দ করি এবং তার মুড, ভাব, অনুভূতি অনুধাবণ করে নিজের মনকে সেই অনুভূতির দোলায় সমগ্র দেহকে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে সঞ্চালন করি এবং মনের অভিব্যাক্তি কোন একটি থিমের সাথে সংযোগ করি (এই থিমই হবে গল্প) তার আলোকে দেহের বিভিন্ন অংশের সেগমেন্টেশনের মুভমেন্টে দেহ ও মনকে পরিচালিত করি তাহলে এ্যাবস্ট্র্যাকশন আর্ট ফর্মের সৃষ্টি হবে। নিজের অনুভূতি যত দক্ষতার সাথে প্রকাশ পাবে শিল্পকর্ম তত ফরর্মেটিক হবে এবং নান্দনিকতায় পর্যবেশিত হবে।

এ্যাবস্ট্র্যাকট মুভমেন্ট থিমেট্রিক্যালি ডিজাইনের সাথে প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে কিছু নিয়মতান্ত্রিকতা প্রভাব আছে। দেহের মুভমেন্টগুলোকে সঞ্চালনে কর্পোরাল টেকনিকের ব্যবহার করতে হবে। এই জন্য মনের সাথে দেহকে জিয়োমেট্রিক্যাল ফর্মে ফুটিয়ে তোলা বা ব্যাবহার করা দরকার। তারজন্য দেহের নমনীয়তা, দেহের বিভিন্ন অংশের সেগমেন্টেশন মুভমেন্ট, পেশীর সংকোচন ও মুক্ততা, শ্লো মোশন, পাপেটিক মুভমেন্ট, মেকানিক্যাল মুভমেন্ট ইত্যাদির দক্ষতা বা আয়ত্ব করার এবং অনুশীলন প্রযোজ্য। মুভমেন্টের প্রধান ও মূখ্য উৎস হল শ্বাস প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ।

(দেহের এ্যালাইনমেন্ট, নমনীয়তার চর্চা, বিভিন্ন টেকনিক্যাল মুভমেন্টের, ব্রিদিং ইত্যাদির উপর আমি ধারাবাহিক ভিডিও পর্ব নির্মাণের পরিকল্পনা করেছি, হয়তো কারো এ্যাবস্ট্র্যাকট মাইম চর্চার ক্ষেত্রে উৎসাহ সৃষ্টি করত পারে )।

আমরা যদি বিভিন্ন ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করি তাহলে প্রত্যেকেই তার স্ব স্ব চিন্তা চেতনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেস্ব আইডেন্টিক্যাল স্টাইল তৈরি করতে সক্ষম। আমরা যারা মারর্সেল মারসুর অনুকরন করি এবং এ্যাবস্ট্রাকট ও ফিজিক্যাল মাইম এর ধারা রপ্ত করতে পরি তাহলে ফিউশনের মাধ্যমে নতুনত্বের উপস্থাপন অস্বাভাবিক নয়। মূকাভিনয়কে সংকীর্ণতার উর্দ্ধে চিন্তা করে অনুশীলন করার পক্ষে আমি। কোন নির্দ্ধারিত ব্যাকারণ দিয়ে সীমাবদ্ধ করার অবকাশ আজ আর নেই। স্বতন্ত্র শিল্পেরও ব্যপ্তি আছে। তার উন্মেষ ঘটাতে গেলে চিন্তাধারা, চিন্তাশক্তিকে কল্পনার ফানুষে সীমাহীন রেখায় নিজেকে নিয়ে যেতে হবে এবং সেই সাথে দর্শকদেরকেও।

মার্সেল মার্সোর একটা স্কেচ আছে পেইন্টার। তিনি পেইন্ট করতে করতে নিজেকে এক সময় যোদ্ধা ভাবলেন। ভাবনা থেকে ফিরে আবার রং তুলি নিয়ে চিত্র অংকনে মনোনিবেশ করলেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে বেহালা বাদক ভাবতে শুরু করলেন। এই ভাবনাগুলো তার কর্মের মুভমেন্ট থেকেই এসেছে। যা দর্শকদেরকে সহজেই বোধগম্য করে তোলে। বিষয় হলো- তুমি কিভাবে চিন্তা করছো, ভাবছো। সেই চিন্তা ভাবনা মনের মাধুরী দিয়ে দৈহিক সঞ্চালনে চিত্রায়িত করছো। সেই চিত্র রিয়েলিস্টিক হতে পারে। এ্যাবস্ট্র্যাকট হতে পারে বা সংমিশ্রণে প্রকাশ ঘটতে পারে। এ্যাবস্ট্র্যাক্ট মুভমেন্টের মধ্যে অর্থাৎ মাইমের ফিজিক্যাল মুভমেন্টের মধ্যে ৫টি প্রিন্সিপ্যাল প্রয়োগ করতে হবে যা পারফরমেন্সের মধ্যে নাটকের হৃদয় হিসেবে ফুটে উঠবে। সেগুলো হচ্ছে- বিরতি (পজ), দ্বিধা (হেজিটেশন), ওজন (ওয়েট), প্রতিরোধ (রেজিসটেন্স) এবং বিস্ময় (সারপ্রাইজ)। এই সকল নীতিমালা লেখনির মাধ্যমে বোধগম্য দূরুহ, তবে কর্মশালার মাধ্যমে আয়ত্ব করা সম্ভবপর।

(এগুলোর উপর ধারাবাহিক ভিডিও পর্বেরও পরিকল্পনা রয়েছে)।

এই সকল নীতিমালার দ্বারা কর্পোরাল মাইম শরীরের অত্যাবশক গুরুত্ব এবং মঞ্চে শারীরিক ক্রিয়াকে বাড়িয়ে তোলে।

কর্পোরাল মাইম অভিনেতা দেহটিকে তার কাজের কেন্দ্র স্থাপন করে নাটকের মর্মটি তৈরি করতে, শরীরে কোনও ক্রিয়াকলাপের সমস্ত নীতিকে সংহত করার চেষ্টা করেন মূকাভিনেতা। মূলকথা হলো- কর্পোরাল বা এ্যাবস্ট্র্যাকট বা ফিজিক্যাল মাইম শারীরিক থিয়েটারের একটি দিক যার উদ্দেশ্য হলো নাটক বা পারফরমেন্সটি প্যান্টোমাইম বা মার্সোর মাইমের মতো কথার অঙ্গভঙ্গির পরিবর্তে চলমান মানবদেহের ভিতরে রাখা।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*